ফিরোজ আহমেদ এর লেখালেখি
বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১৬
শিল্পের টানে একজন গুলজার হোসেন উজ্জ্বল
আমি মূলত গানের মানুষ নই।তবু একজন গানের শ্রোতা হিসেবে নিশ্চয় গান নিয়ে কিছু কথা বলা যায়। আর সেটা যদি হয় রবীন্দ্র সংগীত, তাহলে এই বাণীপ্রধান গান নিয়ে কবিতার মানুষের কিছু কথা বলার অধিকার থাকতেই পারে । কবি রবীন্দ্রনাথের গান ভেতরে ধারণ না করে গাওয়া যায় না। এটা শুধু সুরের ব্যাকরণ জানলেও গাওয়া যায় না।বাণীর গহীন অতলে যেতে সক্ষম না হলে এইসব গভীর শিল্প নিয়ে খেলতে নামলে তা ছেলেখেলা হয়ে যেতে পারে। শুনছিলাম প্রিয় গুলজার হোসেন উজ্জ্বল এর রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে নতুন একটি এ্যালবামের গান। "সুরের মেলা" থেকে প্রকাশিত এ্যালবামটির নাম- "কী সুর বাজে"। পরিচিত দশটি গান দিয়ে সাজানো হয়েছে এই এ্যালবামটি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে আমার ভালো লাগে।মিঠে নরম সুর, গভীর কথামালা আর কেমন যেন এক নির্মল পরিবেশের গন্ধে আমার দিন যাপনের কষ্টরা সরে যায়। সমকালীন জীবনের সাধ আর সাধ্যের বিভেদে আমি যখন খুব ক্লান্ত হয়ে উঠি , তখন সকাল বেলার একটি রবীন্দ্র সংগীত আমার জন্য বহুদূর হেঁটে এসে এক গ্লাস ঠান্ডা জল পান করাই শুধু নয়, জল পানের পরে শিরায় শিরায় সেই অনুভূতি চলে যাওয়ার মতোই শান্তি আসে। তবে--, তবে সেই গানটি হতে হবে বাণী ও সুরে হৃদয়ে ধারণ করে একজন প্রকৃত শিল্পীর কণ্ঠে।নারী শিল্পীদের কণ্ঠে অল্পকিছু রবীন্দ্র সংগীত ভালো লাগলেও কবির গান পুরুষ শিল্পীদের কণ্ঠেই আমার কাছে বেশি ভালো লাগে। তার কারণ হতে পারে এসব গান মূলত পুরুষের অনুভূতি। যদিও অনেক গান রয়েছে যেখানে এই কথা টিকেনা। তবু জীবন আর জগতের নির্যাস নিয়ে কবি বাণী ও সুরের যে মালা গেঁথেছেন সেটা অনুভব করতে হলে গভীর ধ্যানমগ্ন পথ পেরিয়ে আসতে হয়। শুধু শ্রবণ ইন্দ্রিয় থাকলেই এসব গান শোনা যায় না। পরিশীলিত মনন আর সাহিত্যের পাঠ থাকাও কম জরুরী নয়।তাহলে এইসব বিষয় বিবেচনা করে এবার আসা যাক শিল্পী গুলজার হোসেন উজ্জ্বল এর গানের কথামালায়। গুলজার হোসেন পেশায় একজন ডাক্তার। নেশায় একজন শিল্পী। শিল্পী মানে তিনি নানা মাত্রার শিল্প চর্চা করা একজন মানুষ। গান ছাড়াও শিল্পের নানা বিষয়ে তার পদ চারণা রয়েছে।তিনি নিখুঁত অভিনয় করেন।কথা সাহিত্যে তার লেখার হাতকে আমার বেশ ভালো লাগে। মধ্যবিত্ত জীবন যাপনের নানা ঘাত প্রতিঘাত থেকে উঠে আসা মানুষের সব রকম জীবন-অভিজ্ঞতা তিনি তার শিল্পে খুব সহজে ঢেলে দিতে পারেন বলেইআমার মনে হয়েছে। শিল্পের জন্য প্রথম পাঠ হলো মানুষ। মানুষের পাঠ তিনি খুব ভালোই করেছেন বলা যায়।
যে দশটি গান দিয়ে এ্যালবাম সাজানোঃ
১। আজ তোমারে দেখতে এলাম ২। প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে ৩। কী সুর বাজে আমার প্রাণে ৪। স্বপন পারের ডাক এসেছে ৫ আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ ৬। চোখের আলোয় দেখেছিলাম ৭। যদি তারে না-ই চিনি ৮।অগ্নিবীণা বাজাও তুমি ৯। তুমি কোন কাননের ফুল ১০।ভূবনেশ্বর হে
আজ সকালে আমার রবীন্দ্রনাথ এলেন শিল্পী গুলজার হোসেনের কণ্ঠে চেপে। গানের গ্রামার আমি ভালো বুঝি না, তবে কম পড়লে বুঝি। আর যেটা বুঝি সেটা হলো কতোটা ভেতর থেকে আসছে এই স্বর। কতোটা ঋদ্ধ আর সত্য অনুভব। সেখানে বেশ ভালো করেছেন শিল্পী। তবে কোথাও কোথাও মনে হয়েছে তার গদ্য লেখার মতো প্রাঞ্জল না হয়ে কিছুটা ঘাটতি খুব সরু রেখায় হলেও উঁকি দিয়েছে।এটা হতে পারে গানে আমার কম শিল্পবোধের কারণে। আর বেশি ভালো লেগেছে উচ্চারণের গাম্ভীর্য ভাবটা বজায় রাখার প্রয়াস। চঞ্চল মানুষ কবির গান গাইতে পারেনা। এখানে সদা গম্ভীর শিল্পী গুলজার হোসেনের জন্য কাজতা বোধ হয় সহজই হয়েছে। বাণীর ভেতরে গিয়ে, তার অর্থ কে মননে ধারণ করে গাইতে পেরেছেন শিল্পী। এখানেই আমার ভাললাগা উপচে পড়েছে। শুধু কণ্ঠ দিয়ে শিল্পী হওয়া যায় না। শিল্পের নান্দনিক পাঠ শিল্পীর থাকতে হয়। সাহিত্যে পদচারণার কল্যাণে সেটা ভালোই পেরেছেন 'কী সুর বাজে' এ্যালবামের শিল্পী।
কবিতা আর গানে পৃথক ভাবে আমাদের মনে অনুরণন হয়। কবিতায়ও গীতিধর্মিতা থাকে। তবে গানের গীতিময়তা আমাদের সহজে অনুপ্রাণিত করতে পারে। আজ সকালের গুলজার হোসেনের কণ্ঠের রবীন্দ্র সংগীত শুনে মনে হলো জঙ্গিরা কী এসব গান শোনে না? হয়তো নয়। এসব গান শুনলে আর বুঝলে, গ্রেনেডগুলি গোলাপ ফুল হয়ে যেতো। আমাদের আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থকেন্দ্রিক জীবন আমাদের নিয়ে এসেছে এক অচেনা সময়ে। নিয়ে এসেছে এক অদ্ভুত কালচারে। আমাদের পরিবারগুলোতে শুধু টাকার চর্চা না হয়ে নান্দনিক শিল্পের এমন চর্চা হলে আজ আমাদের এমন চেহারার দেশ দেখতে হতো না। আপনারা যাকিছু করেছেন, তার ফল ভালো হয়নি। তাই শিল্পের ছায়ায় একবার এসে দেখুন। সুফল প্রতীক্ষমাণ ।
https://www.youtube.com/playlist...
বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬
মেয়েটির চিকিৎসা দরকার, শাস্তি নয়।
রাষ্ট্রীয় বিধানে তাকে ক্ষমা করার সুযোগ রয়েছে। জানি এতে সামাজিক প্রভাব খারাপ দিকে যেতে পারে। তবু, মেয়েটি যেহেতু মানসিক ভাবে সুস্থ নয়। সে পেশাদার খুনীও নয়। তাকে নির্বাসনে দিয়ে হলেও ক্ষমা করা হোক।
বেঁচে থাকাটা তার জন্য কম শাস্তির নয়।ইডিপাস জেনেছিলো এই বেদনা কেমন। তাকে বিদেশী কোনো আশ্রমে রাখা হোক।যেভাবে হোক, বেঁচে থাকুক মেয়েটি।
বেঁচে থাকাটা তার জন্য কম শাস্তির নয়।ইডিপাস জেনেছিলো এই বেদনা কেমন। তাকে বিদেশী কোনো আশ্রমে রাখা হোক।যেভাবে হোক, বেঁচে থাকুক মেয়েটি।
মেয়েটি চিকিৎসা দরকার, শাস্তি নয়।
রাষ্ট্রীয় বিধানে তাকে ক্ষমা করার সুযোগ রয়েছে। জানি এতে সামাজিক প্রভাব খারাপ দিকে যেতে পারে। তবু, মেয়েটি যেহেতু মানসিক ভাবে সুস্থ নয়। সে পেশাদার খুনীও নয়। তাকে নির্বাসনে দিয়ে হলেও ক্ষমা করা হোক।
বেঁচে থাকাটা তার জন্য কম শাস্তির নয়।ইডিপাস জেনেছিলো এই বেদনা কেমন। তাকে বিদেশী কোনো আশ্রমে রাখা হোক।যেভাবে হোক, বেঁচে থাকুক মেয়েটি।
বেঁচে থাকাটা তার জন্য কম শাস্তির নয়।ইডিপাস জেনেছিলো এই বেদনা কেমন। তাকে বিদেশী কোনো আশ্রমে রাখা হোক।যেভাবে হোক, বেঁচে থাকুক মেয়েটি।
মঙ্গলবার, ২৮ জুন, ২০১৬
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: জীবন ও সাহিত্য
![]() |
কবির কবরের পাশে যখন দাঁড়ালাম, নাম ফলকে দেখতে পেলাম-
“আসসালামু আলাইকুম ইয়া
আহলাল ক্বুবুরি
এটা প্রস্থান নয়,বিচ্ছেদ নয়
শুধু এক শব্দহীন অস্বীকার
নামঃ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (৩৪)
জন্মঃ ১৬ অক্টোবর ১৯৫৬
মৃত্যুঃ ২১ জুন ১৯৯১ ”
আমি একটি ছবি তুললাম। কিছুক্ষণ থেমে আমি আর
একটি ছবি নিলাম, সেখানে উপরের লাইনটি কেন যেন বাদ পড়ে গেলো। হয়তো প্রিয় রুদ্র ওটা চায়নি।
মৃত্যুর পরে অনেকেই লাশের সাথে দর্শন ফলায়। ফলকের নামেও একটি বানান ভুল।
শহিদুল্লাহ না লিখে তারা লিখেছেন শহীদুল্লাহ।এখানেও সূক্ষ্ম কিছু দর্শন আছে।থাক
সেসব। আসা যাক মূল আলোচনায়।
কবির কবরের পাশে গবেষক
রেজাউল আহমেদ
আমাদের ভ্রমণটি ছিলো শুধু বিনোদনের নয়, গবেষণার। আমার বন্ধু
রেজাউল আহমেদ গবেষণা করছে কবি “রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহঃ জীবন ও সাহিত্য” বিষয়ে। তার ভ্রমণসঙ্গী
হিসেবে একজন প্রগতিশীল কবি থাকলে ভালো হয় ভেবে আমাকে জড়ালো। জড়িয়ে আমিও বেশ খুশি
হলাম। কবির ছোট ভাই হিমেল বরকত আমাদের নানাভাবে সাহায্য করলেন। তার এক বন্ধুর সাথে
কথা বলিয়ে দিলেন। আমরা নানা ঝামেলা পেরিয়ে মোংলা গিয়ে পৌঁছলাম।
রাতেই একবার ঘুরে এলাম মিঠেখালি, যেখানে আমাদের রুদ্রের কবর
এবং তার জীবনের অনেক কিছুই রয়েছে। বড় একটি মাঠের পাশে রুদ্র স্মৃতি সংসদ। দেখে
আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেলো। এতোদূর থেকে এসে এমন ভালোবাসাহীন পরিবেশ দেখে কারই বা
ভালো লাগে। একটা ভাঙা বুক সেলফ এ কবির বেশির ভাগ বই-ই নেই। কয়েকটা ধর্মীয় বই সেখানে শোভা পাচ্ছে।আমাদের রাতের
আড্ডাটা ছিলো অল্প সময়ের। কবির ছোট ভাই সুমেল সারাফাত (একমাত্র এখন কবি পরিবারের
যিনি সেখানে থাকেন) ভাইয়ের সাথে কথা হলো আগামীকাল সকালে আমরা আসবো।
সকালে আমাদের বহনকারী অটো যেখানে নিয়ে হাজির
করলো আমরা খুব অবাক হলাম। বিশাল জমিদারি এক বাড়ি। প্রাচীন বনেদী পরিবার বলতে যা
বোঝায়, তার সব দিয়ে সাজানো এক
বাড়ি।বাড়িতে প্রবেশের পথেই কবির নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাড়ির ভেতরে গিয়ে
পেয়ে গেলাম সুমেল ভাইকে। বিশাল এই বাড়িতে তিনি একাই থাকেন। এমন কি তার স্ত্রী এবং
সন্তানও থাকে ঢাকায়। প্রথমে কবির কবর দেখে এসে আমাদের আলোচনা শুরু হলো। আমার গবেষক
বন্ধুর চেয়ে আমার কৌতূহল নানা বিষয়ে।
কবির নামে প্রতিষ্ঠিত
স্কুলের সামনে লেখক
বিষয়গুলি আমি আগে থেকেই সাজিয়ে এনেছি-দিন যাপনের
অভাব, তসলিমা নাসরিনের সাথে
প্রেম-বিয়ে-ছাড়াছাড়ি, বাবার সাথে শীতল সম্পর্ক, ঢাকা ছেড়ে মিঠেখালিতে জীবনের শেষ কয়েকটা বছর, গানের দল ও গান লেখা, তসলিমার সাথে পরিবারের অন্যান্যদের তখনকার সম্পর্ক এবং
এখনকার ধারণা ইত্যাদি। বইপত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি কবি রুদ্র মুহম্মদ
শহিদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ অক্টোবর ( ২৯ আশ্বিন ১৩৬৩
বঙ্গাব্দ।)। জানা গেলো, কবি জন্মেছিলেন বরিশাল জেলার আমানত গঞ্জের রেডক্রস হাসপাতালে। কবির পৈতৃক
নিবাস বাগের হাট জেলার মোংলা থানার অন্তর্গত সাহেবের মেঠ গ্রাম। আর আমরা যেখানে
এসেছি সেটা তার নানাবাড়ি। যদিও সাহেবের মেঠ আর মিঠেখালী কাছাকাছি গ্রাম।
কবির শৈশবের অধিকাংশ সময় এই নানাবাড়িতেই
কেটেছে। পিতা-ডাঃ শেখ ওয়ালীউল্লাহ (১৯৩৩-১৯৯৬) এবং মাতা-শিরিয়া বেগম
(১৯৪৪-২০০৪)।পরিবারের প্রথম পুত্র সন্তান হিসেবে দুই পরিবারের আদরেই কেটেছে কবির
শৈশব। মেধাবী শহিদুল্লাহর শিক্ষা জীবনের শুরু হয় মিঠেখালীর পাঠশালায়। এখানে তার
নানার নামের স্কুলে(ইসমাঈল মেমোরিয়াল স্কুল)দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন ১৯৬৪
খ্রিষ্টাব্দে। পরে ১৯৬৬ সালে সেন্ট পলস উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শেণিতে ভর্তি হন।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে ঢাকায় এসে ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল এ ভর্তি হন।
এস.এস.সি. রেজিস্ট্রেশনের সময়ে কবি তার নামের পূর্বে রুদ্র শব্দটি যোগ করেন। ১৯৭৩
সালে তিনি এসএসসি পাশ করে। পরে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশবিদ্যালয় থেকে
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কবির নানাবাড়ির সামনে লেখক
কবির শোবার ঘর
এসব
তো বই ঘেঁটেই পাওয়া যায়। আমি জানতে চাই ভেতরের খবর যা, অনেকেই জানে না। কবির অভাব
বিষয়ে এখানে এসেই আমরা বেশ অবাক হয়েছিলাম। কারণ দেশ স্বাধীনের আগেই যার পিতা একজন
ডাক্তার, তাদের অভাব থাকার কথা নয়।
আর মায়ের দিক থেকে তারা কয়েকশত বিঘা জমি পেয়েছে, যেখানে কবির ঢাকা ছাড়ার পরে মাছ চাষের
প্রকল্প করেছিলেন। কবি খামারের নাম
রেখেছিলেন— সোনালি মৎস খামার। আমরা জানতে পারলাম, অভাব মূলত দিন যাপনের কারনে কিছুটা সৃষ্টি
হতো। অনেকটা সখের অভাব। সারা মাসের খরচের টাকা বন্ধুদের নিয়ে এক সপ্তাহেই শেষ করে
ফেলতেন। এরপর তসলিমার সাথে প্রেম হওয়ার পরে তার খরচ নানা কারনে বেড়ে যায়। শোনা গেল
তসলিমার শিক্ষার অনেক খরচও কবি চালাতেন।আর
তখন এখনকার মতো টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা ছিলো না। তাই এক মাসের খরচের টাকা সাত দিনে
শেষ হলে তো কিছুটা সমস্যা হতেই পারে। সেসময়ে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিতে হতো। দিন
যাপনের হাল এবং চেতনাগত বিষয়ে বাবার সাথে তার মিল ছিলো না। তাই খুব একটা কথা হতো
না। একটা শীতল সমপর্ক ছিলো তাদের মধ্যে, যদিও কখনো বিবাদ হয়নি বলে জানা গেলো। দুজন
দুজনের প্রতি একটা দূরত্ব বজায় রেখেই চলতেন। কবি টাকা চাইতেন সাধারণত তার মায়ের
কাছে। এবং অদ্ভুত এক বাক্যের চিঠি লিখতেন-‘আমার কিছু টাকা লাগবে’। অথবা-‘আমার হাত খালি’।
পারিবারিক মৎস খামারের
সামনে কবির ভাই সুমেল সারাফাতের সাথে লেখক
ও গবেষক
মিঠেখালিতে থাকাকালীন
খামারের এই পাহারাঘরে আড্ডা দিতেন কবি
তসলিমা প্রসঙ্গ আসলে সুমেল ভাই নড়েচড়ে বসলেন।
কথা বলে বোঝা গেলো ভালোবাসা আর অভিমানমিশ্রিত কিছু রাগ রয়েছে তার প্রতি। কবির
পরিবারের অন্যদের সাথে কথা বলেও এই একই অবস্থা দেখা গিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, তসলিমার সাথে ছাড়াছাড়িটা
না হলে কবির জীবন যাপনের এমন অবস্থা হতো না। ঢাকা ছেলে মিঠেখালীতে গিয়ে থাকা, অনিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন, জীবনের প্রতি ভালোবাসা উঠে
যাওয়া-এসব তসলিমার প্রতি বিরহের কারনেই হয়েছে বলে তারা মনে করেন। শুরুতে তসলিমাকে
তারা সবাই খুব ভালোবাসতেন। ঢাকার শিক্ষিত ভাবী হিসেবে তারা তাকে সমাদরও করতেন।
মিঠেখালিতে
তসলিমা গেলে তারা তাকে আপন করেই নিয়েছিলেন। এখানের পানি লবণাক্ততার কারণে খাওয়া
যায় না বলে তারা বৃষ্টির পানি ধরে রাখেন। সেই পানিতে পোকা হয়। তসলিমা নাকি
বলেছিলেন, কীটযুক্ত পানি। সেই কথা
তারা আজও মনে রেখেছেন। বিয়ের পর ভাই ভাবীর কাছে থেকে শিক্ষা জীবন চালাতে চেয়েও
তারা পারেনি। এখানেও তাদের অভিমান রয়েছে। বাসায় উঠেও অবাঙালিসুলভ আচরণ পেয়ে বাসা
ছাড়তে হয়েছে তাদের।
১৯৮১ সালে অনেক প্রেমের পর কবির বিয়ে হয়েছিলো
তসলিমা নাসরিনের সাথে। দুজন স্বাধীনচেতা মানুষ এক ছাদের নিচে থাকতে গেলে বিবাদ
কাটিয়ে উঠা সকলের পক্ষে সম্ভব হয়না। তসলিমার কাছে শুনলে হয়তো আমরা নানা অভিযোগ
পাবো। আমি তসলিমা নাসরিনের পক্ষ নিয়ে কিছু প্রশ্ন করার চেষ্টা করেছিলাম। যেমন
সুমেল ভাই তসলিমার অনেক পুরুষের সাথে মেশা এবং বিশেষ কিছুর ইঙ্গিত করলে আমি এই একই
বিষয়ে কবির কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা তুলেছিলাম। কবির কী এই একই দোষ বা অভ্যাস ছিলো না? সুমেল ভাই জানে সেটা ছিলো
বটে। তবে বাড়ির কেয়ারটেকার এবং অন্যদের সাথে কথা বলে বোঝা গেলো তসলিমা নাসরিনের
ভালোবাসা হারিয়ে কবি বোহেমিয়ান জীবন যাপন করেছেন। ঢাকা ছাড়ার কারন শুধু তসলিমা নয়, ছিলো বন্ধুদের সাথেও
সম্পর্কের অবনতি। জাতীয় কবিতা পরিষদের যুগ্মসম্পাদক রুদ্র দেখলেন স্বৈরচার তাড়ানোর
জন্য গঠন করা পরিষদেও ঢুকেছে স্বৈরাচার। মঞ্চে এসব বলা হলে বিবাদ চরম আকার ধারণ
করে। ক্ষোভে আর অভিমানে কবি কবিতা পরিষদ ত্যাগ করেন। গ্রামের বাড়ি মিঠেখালিতে গিয়ে
ওঠেন কবি।
কবির অনেক কবিতায়ই মিঠেখালির নাম শোনা যায়।
মানুষের মানচিত্র সেই সময়ে মিঠেখালিতে থেকেই লেখা। কবির বেশির ভাগ গান লেখা হয়েছে
এখানেই। একটি গানের দলও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এলাকার কিছু স্বভাব কবি আর বাউল
প্রকৃতির মানুষদের নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন— “অন্তর বাজাও” গানের দল। সেই গানের দলের অন্যতম সদস্য গোলাম
মোহম্মদের সাথে আমাদের কথা হলো। তিনি খুব গর্বের সাথেই বললেন, কবির অনেক গানের মূল ভাবনা
ছিলো তারই, বা অনেক গানের ভেতরের দুই একটা কথাও তার। এটা কবি ভালোবেসেই নিয়েছেন। জানিনা
এটা কতোটা সত্য। আমরা শুনলাম ভালো আছি ভালো থেকো গান সৃষ্টি হবার শানেনুযূল।
গানের দলের অন্যতম সদস্য
গোলাম মোহম্মদ
বাবার সাথে কবির কখনোই খুব ভাল সম্পর্ক ছিলো
না। পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা আগেই শুনেছিলাম শীতল সম্পর্কের কিছু কথা। পরে এলাকার
লোকের সাথেও আমাদের এই বিষয়ে আলাপ হলো। সেই আলাপে পেলাম নানা ধরণের তথ্য। তারা
জানালো, কবির মামা ছিলেন এলাকার
নাম করা রাজাকার। তাদের বাড়িতেই পাক আর্মি থাকতো। তিনি তখন এলাকার চেয়ারম্যান। কবির
বাবা ছিলেন মোংলা পোর্টের ডাক্তার। শ্বশুর বাড়ির কারণে তাকেও নাকি সেনাদের চিকিৎসা
করতে হয়েছে। কেউ কেউ বললেন, রাজাকারের লিস্টে তারও নাম রয়েছে। আমরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অফিসে
গিয়েছিলাম নথিপত্র দেখতে। দীর্ঘ অপেক্ষা করেও তাদের না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। শুধু
মানুষের কথায় তাই বিশ্বাস অবিশ্বাস কোনটাই করিনি আমারা। তবে কবির বাবা কারো ক্ষতি
করেছে এমন কোনো কথা কেউই বলেনি। আর আমরা জানলাম, তিনি ছিলেন বেশ রক্ষণশীল।“বিষ বিরিক্ষের বীজ” বইটি নাকি কবি তার বাবাকে
নিয়েই লিখেছেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যুদ্ধে যেতে
চেয়েছিলেন কবি। তাকে ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো।কবির পরিবার বলে, তাদের বাবাকে আটক করেছিলো
পাক সেনারা, তাই তাদের মা রুদ্রকে আর যুদ্ধে যেতে দেননি। এলাকার মানুষ অবশ্য তার উল্টোটাই
বলেন। কবিকে তার মামা এবং বাবাই নাকি আটকে রেখেছিলেন। এসব ভাবনা থেকে আমরা কবির
সাথে তার বাবার শীতল সম্পর্কের বিষয়ে কিছুটা অনুভব করতে পারি। হাজীসাব বাবার
নাস্তিক পুত্র হলে সম্পর্কের বিষয়টা বোঝাই যায়। আমরা এলাকার মানুষের কাছে তার
সম্পর্কে মনোভাবও তার বাবার মতোই দেখেছি। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অনেকের সাথেই
আলাপ করে দেখেছি। তারা বলে, “শুনেছি ঈমান ছিলো না। আর এক কাফের মহিলাকে বিয়ে করেছিলো।নামাজ রোজা করতো
না।তবে মানুষের উপকার করতো।"
রুদ্রের কয়েকজন শহুরে বন্ধুর সাথে আমাদের
আলাপ হলো। তারা কেউই তাকে বিশেষ সম্মান দিতে চায়নি। কবি নির্মলেন্দু গুণ অবাক হলেন
রুদ্রকে নিয়ে পিএইচডি করা হচ্ছে শুনে। তিনি বললেন, এটা অনুমোদন করলো? তার এক বন্ধু তার অভাবের
গল্পই শুধু করলেন।তার সাহিত্য বোঝার এবং অনুভব করার বন্ধু যারা তাদের অনেকেই এখন
দেশের বিশেষ মানুষ।তবে সকলের আলোচনা থেকে বোঝা গেলো রুদ্র তখনকার হিরো-ই ছিলেন।তার
ছিল বিশেষ সাংগঠনিক ক্ষমতা। কবি নুরুল হুদা এবং কবি অসীম সাহা কবির জীবনের অনেক
ঘটনার সাথেই সম্পৃক্ত ছিলেন।তসলিমা নাসরিনের সাথে বিয়ে থেকে বিচ্ছেদ এবং আপোষ করার
চেষ্টা, অনেক বিষয়ে তারা সাহায্য
করেছেন।
এবার আমরা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর
সাহিত্য নিয়ে কিছু আলোচনা করতে পারি। প্রথমে তার গ্রন্থগুলি দেখে নিইঃ
১।
উপদ্রুত উপকূল- বুক সোসাইটি – ১৯৭৯
২।
ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম—দ্রাবিড়
প্রকাশনী – ১৯৮১
৩।
মানুষের মানচিত্র—সব্যসাচী
প্রকাশনী—১৯৮৪
৪।
ছোবল – দ্রাবিড় প্রকাশনী—১৯৮৬
৫।
গল্প – নিখিল প্রকাশনী—১৯৮৭
৬।
দিয়েছিলে সফল আকাশ—মুক্তধারা
প্রকাশনী --- ১৯৮৮
৭।
মৌলিক মুখোশ—সংযোগ
প্রকাশনী—১৯৯০
মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়ঃ
৮।
এক গ্লাস অন্ধকার—বিদ্যাপ্রকাশ
– ১৯৯২
৯।
বিষ বিরিক্ষের বীজ- (কাব্যনাট্য)—বিদ্যাপ্রকাশ—১৯৯২
১০।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র (২ খন্ড) সম্পাদনা-অসীম সাহা—১৯৯২
১১।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শ্রেষ্ঠ কবিতা—সম্পাদনা- অসীম সাহা--- ১৯৯৪
১২।
রুদ্রের নির্বাচিত অণুকাব্য—সম্পাদনা-
হিমেল বরকত ও আহসানুল কবির—সমুদ্র
সাহিত্য পরিষদ- ১৯৯৬
১৩।
পাঁজরে পুষ্পের ঘ্রাণ-প্রকাশকঃসুবীর ওবায়েদ, চট্টগ্রাম –১৯৯৬
১৪।
রোদের সকাল ও সকালের রোদ—পত্র
সংকলন, কলকাতা—২০০৪
১৫।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনাবলী ( ২ খন্ড) –সম্পাদনা-হিমেল বরকত—মাওলা ব্রাদার্স—২০০৫
১৬।
সোনালি শিশির—গল্পগ্রন্থ
–মাওলা ব্রাদার্স—২০০৫
১৭।
রাজনৈতিক কবিতা—বিভাস—২০১২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখা সম্পর্কে
আলোচনা করলেই তার জীবনও আমরা বুঝতে পারি।আসুন,এবার তার কবিতায় তাকে খুঁজি। কেমন লিখছেন
আমাদের প্রিয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ-
কবি নিজস্ব একটি বানানরীতি অনুসরণ করতেন।সেটি
ছিলো এমন-
তিনি
মূর্ধণ্য ণ কে নির্বাসন দিয়েছিলেন।
শব্দের কথ্যরূপের মতো ও কার ো ব্যবহার করেছেন।
যেমন- কোরে,হোলে,বোলে ইত্যাদি।
ী
খুব কম লিখ ি বেশি প্রয়োগ করতেন।
ূ এর
পরিবর্তে ু প্রয়োগ করতেন।
জ
ফলা বর্জন।
ঙ এর
পরিবর্তে ং
স এর
পরিবর্তে শ ।
কবির
সাহিত্য নিয়ে তার শ্রেষ্ঠ কবিতা প্রকাশ করেছেন তার ছোট ভাই হিমেল বরকত।তিনি
ভূমিকায় লিখেছেন দারুণ কথা-
“বিভিন্ন ভাব-বিষয়-নিরীক্ষার আবর্তে কবির এই
সৃজনবিশ্ব নানা বাঁক নিলেও, কখনো তার কেন্দ্রচ্যুতি ঘটেনি। তাই রুদ্রের কবিতায় মৃত্তিকাস্পর্শী, ঐতিহ্যান্বেষী ও
সমষ্টিলগ্ন কণ্ঠস্বর যেমন যাবতীয় অন্যায়-শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে উচ্চকিত, তেমনি তাঁর হার্দ্য ও
অন্তর্জীবনের রক্তাক্ত ভাষা ধ্যানমগ্ন শিল্পস্বরে মুদ্রিত। এই সমন্বয়-সূত্রই
রুদ্রের কবিতার মৌল শক্তি।" বাংলা সাহিত্যের শিল্পরসিক পাঠক মাত্রেই জানেন, রুদ্র ছিলেন একজন মৌলিক
কবি।তিনি একজন শিকড় সন্ধানী কবিও বটে। আমাদের প্রাচীন জীবনের, সমাজের আর শিকড়ের গহীন
কথাই উঠে এসেছে তার কবিতায়। এসেছে সমকালের প্রগতিশীল রাজনীতির চেতনা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রবল
বিদ্রোহ এবং আধুনিক জীবনের দ্রোহ। রুদ্রের জীবন এবং কবিতা মিলিয়ে দেখলে আমরা তাকে
একজন সত্য অনুভবের কবি হিসেবেও দেখতে পাই। তিনি হৃদয় থেকে যা অনুভব করেছেন, জীবন যাপনে যা ধারণ
করেছেন-সেসবই তুলে এনেছেন তার কবিতায়। শিল্পের সাথে ভন্ডামী কখনোই ছিলো না
তার।
কবির প্রথম গ্রন্থ- উপদ্রুত উপকূল। এই
গ্রন্থে আমরা পাই কবির অন্যতম জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত কবিতা- বাতাসে লাশের গন্ধ। এই
কবিতায় যে দ্রোহ আর ক্ষোভ দেখি সেই দ্রোহ আমাদের এখনো কী নেই? এখনো দেশের অবস্থা সেই
সময়ের চেয়ে কোনো কোনো দিকে এগিয়ে গেলেও, অন্য অনেক দিকে পিছিয়েও গিয়েছে। জাতির পতাকা
এখনো খামচে ধরে সেইসব শকুনেরা।বাতাসে এখনো লাশের গন্ধ ভাসে। এমন কি গন্ধ ভাসে
জলপাই রঙের সীমানায়ও। বিবেক বেঁচে থাকা মানুষেরা আজও ঘুমাতে পারেনা।
শব্দ
শ্রমিক- কবিতায় তিনি বলেন-
আমি
কবি নই- শব্দ শ্রমিক, শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়
হৃদয়ের কালো বেদনায়।
একই
কবিতায় তিনি বলেন--
এ
কেমন ভ্রান্তি আমার
এলে মনে হয় দূরে স'রে আছো, বহুদূরে।
আমি সেই অভিমান-কবিতায় দেখতে পাই গহীন
কথামালা। হৃদয়ের কষ্টের অনুভূতি। বাংলা সাহিত্যে টিকে থাকার জন্যই তিনি এসেছেন, আমরা বুঝে যাই। যেমন--
আমি সেই অবহেলা, আমি সেই নতমুখ
নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান- ভেজা চোখ,
আমাকে গ্রহণ করো।
ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম (১৯৮১) গ্রন্থে আমরা
প্রেম, দ্রোহ আর প্রকৃতির বন্দনা
দেখতে পাই। তখন রাজনীতি নিয়ে তিনি প্রচুর ভাবেন। সামরিক শাসনে অতিষ্ঠ জাতির
স্লোগান যেন উঠে আসে রুদ্রের কবিতায়।
হাড়েরও
ঘরখানি কবিতায় তিনি লেখেন--
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
বুদ্ধিজীবির রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ।।---
(১)
হাজার সিরাজ মরে
হাজার মুজিব মরে
হাজার তাহের মরে
বেঁচে থাকে চাটুকার, পা-চাটা কুকুর,
বেঁচে থাকে ঘুণপোকা, বেঁচে থাকে সাপ।---(১২)
মানুষের মানচিত্র- গ্রন্থের পটভূমি কবির
গ্রামের বাড়ি মিঠেখালীর। সাধারণ মানুষের জীবনের গহীন কথামালা উঠে এসেছে এই
গ্রন্থের কবিতায়। সাথে সাথে মুক্ত জীবনের আকাংখ্যা আছে এসব কবিতায়।
যেমন কবি
বলেন--
(১)
কবে পাবো আল্হীন একখণ্ড মানব-জমিন?
পরবাস থাকবে না, থাকবে না দূরত্বের এই
রীতি-নীতি।
মহুয়ার মদ খেয়ে মত্ত হয়ে থাকা সেই পার্বনের
তিথি
কবে পাবো? কবে পাবো শর্তহীন আবাদের নির্বিরোধ দিন।।
(২)
রাত্তির কাটেনা আর, দেহের আগুন নেভে, পরান নেভেনা।
(৪)
ভাসান যে দিতে চাও,কোন দেশে যাবা?যাবা সে কোন বন্দরে-
আমারে একলা থুয়ে? এই ঘর যৈবনের কে দেবে পাহারা?
এমন
কদম ফুল-ফোটা-ফুল থুয়ে কেউ পরবাসে যায়!
তুমি
কেন যেতে চাও বুঝি সব, তবু এই পরান মানে না।
এর পরের গ্রন্থ- ছোবল। এখানেই রয়েছে কবির
বিখ্যাত কবিতা ইশতেহার। এই কবিতায় এসে আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি একটি কবিতায় কীভাবে
প্রাচীন যুগ থেকে সমকাল তুলে ধরা যায়। হাজার বছর উঠে এসেছে একটি কবিতায়।
শুরুতেই
দেখি-
- আমরা তখন সোমরস নৃত্য আর শরীরের পবিত্র
উৎসব শিখেছি।
এরপর--
- দূর্বল মানুষেরা হয়ে উঠলো আমাদের সেবার
সামগ্রী।
একই কবিতায় আবার দেখি-
আমাদের নির্মিত যন্ত্র শৃংখলিত করলো আমাদের
আমাদের নির্মিত নগর আবদ্ধ করলো আমাদের
আমাদের পুঁজি ও ক্ষমতা অবরুদ্ধ করলো আমাদের
আমাদের নভোযান উৎকেন্দ্রিক করলো আমাদের।
শেষে এসে সমকালের আকাংখ্যা দেখি--
আমরা আবার আমাদের সমতার পৃথিবী বানাবো।
সম্পদ আর আনন্দের পৃথিবী বানাবো।
শ্রম আর প্রশান্তির পৃথিবী বানাবো।।
কবির পরের গ্রন্থ-গল্প। ১৯৮৭ সালে এই গ্রন্থ
প্রকাশিত হয়। এই সময়ে তসলিমা নাসরিনের সাথে কবির ছাড়াছাড়ি হয়েছে। মিঠেখালী চলে যান
কবি। এই কাব্যের কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতি উঠে এসেছে।
জীবন
যাপন (২) কবিতায় কবি লেখেন-
আমরা কি পরস্পরকে অবিশ্বাস করছি!
একই কবিতায় কবি বলেন--
আমাদের স্পর্শগুলি অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে।
সূর্যাস্তের বিকেলে
পাশাপাশি দুজনের মাঝখানে শুয়ে থাকছে একটি
সাপ।
কবির পরবর্তি গ্রন্থ- দিয়েছিলে সকল আকাশ। এই
কাব্যে প্রেম, প্রকৃতি আর শেকড়ের কথা উঠে এসেছে।
উল্টো ঘুড়ি কবিতায় কবি বলেন--
এতো
সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন!
বুঝি
না আমার রক্তে কি আছে নেশা--
মৌলিক মুখোশ – গ্রন্থে কবি তসলিমার প্রতি ক্ষোভ থেকে লেখেন
একটি কবিতা, যার উত্তরে তসলিমাও একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবির এই কবিতায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ
পায়।
সামঞ্জস্য নামক এই কবিতায় কবি বলেন--
তুমি
বরং কুকুর পোষো
প্রভুভক্ত খুনশুটিতে কাটবে তোমার নিবিড় সময়
শুকোরগুলো তোমার সাথে খাপ খেয়ে যায়,
কাদা
ঘাটায় দক্ষতা বেশ সমান সমান।
আরও অনেক লেখাই রয়েছে কবির, যা দেখে আমরা তার চিন্তা, চেতনা ও জীবনের
অনুভূতিগুলি অনুভব করতে পারি। একজন প্রগতিশীল কবির সমাজ ভাবনা, দেশ ভাবনা, প্রেম, বেদনা ইত্যাদির প্রকাশ
দেখতে পাই। রাজনীতি সচেতন একজন মানুষ, বোহেমিয়ান এমজন কবি, শেষে এসে জীবনকে দাম না
দিয়ে নিজেই যেন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান। আমরা কবির গ্রামে গিয়েও সেটা শুনতে পাই
তার তখনকার সঙ্গীদের কাছে। কবি দিনযাপনের অনিয়মের সাথে নেশা করে মৃত্যুটাকে নিজেই
যেন কাছে নিয়ে আসেন। ১৯৯১ সাল, ১০ জুন পাকস্থলীতে আলসারজনিত অসুস্থতায় ঢাকার
হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা সুস্থ হয়ে ২০ জুন বাসায় ফেরেন। ২১ জুন, শুক্রবার ( ০৭ আষাঢ় ১৩৯৮)
সকাল সাড়ে সাতটায় দাঁত ব্রাশ করার সময়ে Sudden cardiac Arrest
–এ আক্রান্ত হন। এর ১০/১৫
মিনিট পর মারা যান কবি।বাংলা সাহিত্য একটি নক্ষত্রকে হারায়। যদিও প্রকৃত কবির কখনো
মৃত্যু হয় না। রুদ্রেরও মৃত্যু নেই। তিনি তার কবিতায় জ্বলছেন নক্ষত্র হয়ে।
কবির গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের প্রচ্ছদ
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)























